ডাকযোগে" ভোট দিতে অনীহা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বহুদিনের প্রত্যাশা ছিল বিদেশে বসেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া। সেই প্রত্যাশার বাস্তব রূপ হিসেবেই নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে চালু হয় অনলাইনের মাধ্যমে ভোট প্রদান কর্মসূচী। প্রাথমিক পর্যায়ে এই উদ্যোগ প্রবাসীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে। প্রবাসী শ্রমিকরা একে অপরকে সহায়তা করে আগ্রহভরে অনলাইন অ্যাপে নিবন্ধনও করছেন।
প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থাকে অনেকে প্রবাসীরাই ভবিষ্যতমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। তবে অনলাইন নিবন্ধনের পর ভোট দিতে ডাক বিভাগের ওপর নির্ভরশীলতা প্রবাসীদের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি করেছে। যদি নিবন্ধন থেকে শুরু করে ভোট প্রদান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি অ্যাপভিত্তিক হতো, তাহলে উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন প্রবাসীরা—এমনটাই তাদের অভিমত।
এই প্রথমবারের মতো প্রবাসী নাগরিকদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে
ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ব্যবস্থায় অংশ নিতে প্রবাসী ভোটারদের কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হচ্ছে। অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৯ নভেম্বর এবং তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি একটি পরীক্ষামূলক প্রয়াস। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে জটিলতা থাকলে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় বলে ধারণা করেন প্রবাসীরা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এরই মধ্যে প্রবাসী ভোটারদের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশের ডাকবিভাগ থেকে ভোটারদের স্বশরীরে ব্যালট সংগ্রহ করতে হবে। ব্যালটে ভোট প্রদান শেষে নির্ধারিত ফিরতি খামের মাধ্যমে সেটি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
ব্যালট পেপারে ভোট প্রদানের পুরো নির্দেশনা উল্লেখ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তবে নিবন্ধন, ব্যালট পূরণ কিংবা ফিরতি প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুল হলে ভোট বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই কঠোর নিয়মকানুন অনেক প্রবাসীকে আরও দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অভিযোগ, বছরে একদিন ছুটি নেওয়াই অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কর্মস্থল থেকে ডাকবিভাগে যাওয়া, দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম এবং যাতায়াতে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য কষ্টসাধ্য। অনেক ক্ষেত্রে ডাকঘর শহর থেকে বহু দূরে অবস্থিত। ফলে নিবন্ধন করেও ভোট দিতে না পারার বাস্তবতা সামনে চলে এসেছে। এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বড় একটি অংশের প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে ভোট প্রদানে অনীহা তৈরি হয়েছে। ডাকযোগের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার এই পদ্ধতিকে অনেকেই বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে মনে করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬২ জন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে এই সংখ্যা জানা যায়। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কমিশন প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে, একজন প্রবাসী ভোটারের পেছনে গড়ে ৭০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। বিপুল এই ব্যয়ের পরও যদি প্রবাসীদের অংশগ্রহণ কম থাকে, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী ভোটারকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমান কাঠামোতে ভোট প্রদান প্রায় দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। কর্মস্থল কিংবা আবাসস্থল থেকে ডাক বিভাগের দূরত্ব, যানবাহনের ব্যয়বহুলতা এবং সময়ের সীমাবদ্ধতা প্রবাসীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে। ফলে নিবন্ধনের সংখ্যার সঙ্গে ভোট প্রদানের সংখ্যার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব প্রবাসী মোহাম্মদ আনোয়ার মাঝি বলেন, সৌদি আরবে এখন প্রায় সব ধরনের নাগরিক সেবা অনলাইনের মাধ্যমে পাওয়া যায়। ব্যাংকিং কার্যক্রম, ইকামা নবায়ন, এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই করা সম্ভব। এখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর। এমন বাস্তবতায় ভোট প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকার প্রয়োগে যদি পুরনো ডাকনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে প্রবাসীদের অনাগ্রহ স্বাভাবিক বলেই তিনি মনে করেন। আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি না থাকলে এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না।
প্রবাসীদের মতে, বিশ্ব এখন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও বদলে গেছে। ২০২৬ সালে এসেও যদি শতাব্দীপ্রাচীন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা হয়, তাহলে প্রত্যাশিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। অধিকাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বৈধ রেসিডেন্স কার্ড রয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অ্যাপের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই সুবিধা মিলবে। এতে প্রবাসীদের ভোট প্রদানে আগ্রহ বহুগুণে বাড়বে বলেও তারা বিশ্বাস করেন।
এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে এমন অনেক প্রবাসী শ্রমিক রয়েছেন, যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই। তারা চাইলেও বাইরে বের হতে পারেন না। তাদের জন্য ডাকবিভাগে গিয়ে ভোট দেওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আবার অনেকের শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণেও বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। এইসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। প্রবাসীদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ ভোটিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই।
