রেমিটেন্স চায় রাষ্ট্র, নিরাপত্তা দেয় না—

সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে দিন দিন বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্দশা। মাতৃভূমি ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে আসা এসব মানুষগুলো বিভিন্নভাবে দুর্বৃত্তদের হাতে অপহরণের স্বীকার হচ্ছেন, হতাহত হচ্ছেন। বৈধ পথে গিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারছেন না হাজার হাজার শ্রমিক। অনেকে অর্ধাহারে-অনাহারে ভবঘুরের মতো জীবন যাপন করছেন, কেউ মানসিক বিপর্যয়ের শিকার, কেউ কেউ হতাশায় ডুবে আছে, এই দুর্দশাগ্রস্ত প্রবাসীদের ওপর যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। একদিকে জীবন রক্ষা, অন্যদিকে নানা বিপদের মুখে পড়া তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

বেকারত্ব-দারিদ্রতা দূরিকরণ ভালো পরিবেশে বসবাস করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও পরিবারকে অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী করার আশায় বাংলাদেশীরা প্রবাসে পাড়ি জমায়। সম্প্রতি জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিসংখ্যান (বিবিএস) ব্যুরো জানিয়েছে, ‘বিদেশে অবস্থানরত’ প্রবাসীর সংখ্যা ৫০ লাখের অধিক। প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বসবাস করে, তাদের সংখ্যা প্রায় ২.১২ মিলিয়নের উপরে।

সৌদি প্রবাসীদের অভিমত অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সংঘটিত সহিংস ঘটনার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। তারমধ্য,  দূতাবাসের কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি, প্রবাসীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা, একঘেয়েমি, মানসিক চাপ, ক্রোধ ও অমানবিক আচরণ। এসব কারণে অনেক সময় তুচ্ছ ঘটনা থেকেই অপহরণ, চুরি-চিনতাই হাতাহাতি, মারামারি, এমনকি খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে। এছাড়াও, রুমের প্রাইভেসি লঙ্ঘন, মতের অমিল কিংবা সামান্য বিষয়ে বিরোধের জেরে এসব সহিংসতা জন্ম নিচ্ছে। এই ধরণের পরিস্থিতির ফলে সৌদি আরবের মানবসম্পদ বিভাগে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যার ফলে কর্মসংস্থানের বিশাল একটি সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

সৌদি প্রবাসী আনোয়ার মাঝির আক্ষেপ, বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। অথচ, দেশে বা বিদেশে প্রবাসীদের যে সম্মান ও আত্মমর্যাদার দাবি, তা কোনো সরকারই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার নজির দেখা যায়না। বিদেশের মাটিতে প্রবাসী শ্রমিকরা প্রকাশ্যে দিবালোকে অপহৃত হচ্ছে, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হতে হয়, নানা রকম অপমান ও নির্যাতনের সম্মুখীন হন। দুঃখজনকভাবে, এসব গুরুতর বিষয়ে দেশের কর্তৃপক্ষ কোনো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরাজিত হয়েছে।

প্রবাসী জুয়েল পাটওয়ারী জানান, সৌদি মানব সম্পদ বিভাগের সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ভীত গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি। যেমনটি ভারত, পাকিস্তান কিংবা নেপালের দূতাবাসগুলো তাদের নিজ নিজ প্রশাসনিক সংস্থার সঙ্গে গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, “এখানকার প্রবাসীরা নানান সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও, দূতাবাস থেকে চাইলেই সহায়তা পাওয়া যায় না। দূতাবাস যদি সৌদি প্রশাসনিক অধিদপ্তরের সঙ্গে জবাবদিহিমূলক ও সক্রিয় সম্পর্ক স্থাপন করতো, তাহলে যেকোনো সমস্যার সমাধানে তা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।”

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ—ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের বিষয়ে সৌদি আরবের স্থানীয় প্রশাসন বরাবরই সজাগ ও যত্নবান। অনেকেই ধারণা করেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের প্রতি এই অবহেলা বা উপেক্ষার পেছনে রয়েছে কর্মদক্ষতার অভাব। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত বেশিরভাগ বাংলাদেশি শ্রমিকই দক্ষ ও অভিজ্ঞ; এমনকি ভাষাগত জ্ঞানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের চেয়েও তারা যথেষ্ট পারদর্শী।

তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের বহু শ্রমিক অনেকক্ষেত্রেই বাংলাদেশিদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন দক্ষতা ও পারদর্শিতায়। এরপরও বাংলাদেশিদের প্রতি সৌদি প্রশাসনের অনাগ্রহের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে রাষ্ট্রীয় অভিভাবকদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং প্রবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্ব। এসব কারণেই বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা প্রবাসের মাটিতে বঞ্চিত ও অবহেলিত থেকে যাচ্ছেন।

প্রবাসীরা আক্ষেপ করে জানান, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বৈধ উপায়ে সৌদি আরবে আসতে যেখানে তুলনামূলকভাবে খুব কম খরচ হয়, সেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকদেরকে গুণতে হয় এক অস্বাভাবিক উচ্চ ব্যয়। ভারতে সৌদি আরবগামী শ্রমিকদের গড় খরচ পড়ে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও ব্যয় প্রায় একই। এমনকি নেপাল থেকে আরও কম খরচে শ্রমিকরা সৌদি আরবে কাজের ভিসায় আসার সুযোগ পান।

অন্যদিকে, একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে একই ধরনের কাজের জন্য সৌদি আরবে যেতে খরচ করতে হয় প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা—কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই খরচ আরও বেশি হয়ে থাকে। এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার পর যখন দেখা যায় বেতন মাসে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, তখন অনেক শ্রমিকই হতাশ হয়ে বিকল্প পথ খোঁজার চিন্তায় পড়ে যান। আর এই হতাশা থেকেই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা মানসিক একঘেয়েমিতে—যা শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের জন্য।

ভুক্তভোগী প্রবাসীরা জানান, বাংলাদেশ থেকে কিছু অসাধু এবং অদক্ষ (ভাইফোঁড়) এজেন্সি বিদেশে ভালো কাজ ও উচ্চ বেতনের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের সৌদি আরবে পাঠায়। এসব ভিসার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই হয় ভুয়া বা ভুয়া প্রতিশ্রুতিভিত্তিক। সৌদি আরবে এসে শ্রমিকরা বুঝতে পারেন, এজেন্সির দেওয়া তথ্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্রমিকদের মাসখানেক দালালদের কাছে আটকে রাখা হয়। পরে একপর্যায়ে জোরপূর্বক রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়, অথচ হাতে থাকে না কোনো বৈধ ইকামা (কাজের অনুমতিপত্র), না থাকে কোনো চাকরি। এই পরিস্থিতিতে অসহায় শ্রমিকরা বাধ্য হন রাস্তায় মানবেতর জীবন যাপন করতে।

বিগত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি প্রবাসীরা দুর্বৃত্তদের হাতে অপহৃত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিককালে এসব অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর ও আলোচিত হয়েছে। যা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে আতংক বিরাজমান। 

সাম্প্রতিক সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া এলাকা থেকে আরিফ হোসেন (৩০) নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশিকে তার ব্যক্তিগত গাড়িসহ অপহরণ করা হয়েছে। গত (২৯ মে)  ২৪ রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাথা মানফুয়া এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। অপহৃত আরিফ হোসেনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার চরপাতা গ্রামে। তার পিতার নাম আবুল বাশার। তিনি ধার করে একটি গাড়ি কিনেছিলেন, যার কিস্তি এখনও বাকি রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

সাম্প্রতিক কানাডা যাওয়ার কথা বলে কামরুজ্জামান কাকনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেন গাজিপুরের দালাল বাহার উদ্দিন। কাকনকে শেষ পর্যন্ত বাহার উদ্দিন কানাডা পাঠাতে পারেননি। পরে কাকনের ছোট ভাই কামরুল ইসলাম সাগরকে ভালো বেতনে সৌদি আরব পাঠানোর প্রস্তাব দেন তিনি। ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকায় সাগরকে পাঠানো হয় সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে। পরবর্তীতে কাকনকেও কৌশলে বাহার তার ছোট ভাই সাগরের কাছে পাঠান। গত ২২ মে সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের একটি ফ্ল্যাটে এই দুই ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। 

এছাড়াও, সৌদি আরবে এক বাংলাদেশি প্রবাসীর ছুরিকাঘাতে আরেক প্রবাসী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত (৪ ফেব্রুয়ারি) ২৫ মক্কায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফজর আলী (৪০) টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার কোকড়হরা ইউনিয়নের বলধী গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে। নিহতের পরিবার জানায়, রুমের অন্যান্য বাংলাদেশিরা নামাজে গেলে ফজর আলী ও নুরুল রুমে থাকে। নুরুলকে রুমে থেকে বের হয়ে ফোনে কথা বলার জন্য বললে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এভাবে কয়েকবার ছুরিকাঘাত করার কারণে দ্রুত মৃত্যু হয় তার।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি হাফেজ আল আমিন নামে এক মসজিদের ইমামকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সড়কের পাশে তার রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। (২১ মার্চ) ২৫ স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে সৌদি আরবের ইয়েমেন সীমান্তবর্তী শহর জিজানে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ আল আমিনের মরদেহটি উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। 

সৌদি আরবের শহর পবিত্র মক্কায় অ্যাসিড নিক্ষেপ ও ছুরিকাঘাত করে নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছেন এক প্রবাসী বাংলাদেশি। এছাড়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরও একজনকে খুন করেছেন তিনি। (৩১ মার্চ) ২৫ এই হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ওই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের বরাতে এ খবর জানিয়েছে সৌদি গেজেট।

সৌদি আরবে পুলিশের অভিযানের সময় বহুতল ভবন থেকে পড়ে রিদোয়ান (২৭) নামের এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। গত (১৮ মে) ২৫ দিবাগত রাতে মক্কার আল রূসেফা জেলার খালেদিয়া এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

বিশিষ্ট প্রবাসী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা মন্তব্য করেন, সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের যেভাবে হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের শিকার হতে হচ্ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশের শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।  অনেক হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে প্রবাসীদের নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও ভুল বোঝাবুঝির জেরে—তবুও দূতাবাসের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটা চক্র চুরি চিনতাই এবং অপহরণের ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের তেমন কোন পদক্ষেপ দেখা যায়না। তারা বলেন, “আমরা সবাই শ্রমিক। বৈধ উপায়ে উপার্জিত আয় দেশে পাঠাই। অথচ সরকার আমাদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”

সৌদি আরব বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানায়, সব ধরনের হত্যাকাণ্ড মানব সভ্যতার জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং দুঃখজনক। বর্তমান রাষ্ট্রদূত প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে গুরুত্বসহকারে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রবাসীদের অভিযোগকে তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তবে উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরব একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র যার নিজস্ব কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে, যার বাইরে কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। তবুও দূতাবাসের কার্যক্রম পূর্বের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ঢাকা সাভারে সমকামী মেয়ের ছুরিকাঘাতে বাবা খুন!

১৪,৫০০টি যুদ্ধে ৩.৫ বিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে!

পারমাণবিক বোমের ভয়াবহতা!